নবম শ্রেণী ইতিহাস বড় প্রশ্ন
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণগুলি আলোচনা করো।
উত্তর:
ভূমিকা : ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে শেষ হওয়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মাত্র ২১ বছরের মধ্যেই ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের ৩ সেপ্টেম্বর সেটি অপেক্ষা অনেক ব্যাপক, বিধ্বংসী, ভয়াবহ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাত ঘটে। দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী অনেক ঘটনা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংঘটনের অন্যতম কারণ ছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণগুলিকে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ এই দুই ভাগ করা যায়। যথা—
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণসমূহ :
• পরোক্ষ কারণ :
1.ভার্সাই সন্ধির ত্রুটি : ভার্সাই সন্ধির মধ্যে নিহিত ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বীজ রোপন। ভার্সাই সন্ধি জার্মানির ওপর যেভাবে জোর করে এবং অন্যায়ভাবে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল তাতে জার্মান জাতির মধ্যে প্রতিশোধ স্পৃহা জেগে উঠেছিল।
2. জাপানের আগ্রাসী নীতি : প্রাচ্য তথা এশীয় অংশে জাপানের আগ্রাসী নীতি বিশেষ করে জাপানের মাঞ্চুরিয়া আক্রমণ বিশ্বের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল।
3. উগ্র জাতীয়তাবাদ : হিটলারের 'হেরেনভক তত্ত্ব' থেকেই উগ্র জাতীয়তাবাদের জন্ম হয়েছিল যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে সহজতর করে তুলেছিল। বৃহত্তর জার্মান সাম্রাজ্য গঠনে বদ্ধপরিকর হিটলার অস্ট্রিয়া, চেকোশ্লোভাকিয়া, পোল্যান্ড আক্রমণ করায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ হয় ।
4.অতৃপ্ত জাতীয়তাবাদ : জার্মানি, জাপান ও ইটালি—এই তিনটি দেশ নিজেদের অসন্তুষ্ট দেশ বলে মনে করে নিজেদের সাম্রাজ্যবিস্তারের নেশায় মেতে ওঠে। এর ফলে বিশ্বশান্তি বিঘ্নিত হয়ে ক্রমশ বিশ্বযুদ্ধের দিকে চলে যায়।
5. ইটালির আগ্রাসন নীতি : ইটালির ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রনায়ক মুসোলিনি ইতালিকে বিশ্বের দরবারে শ্রেষ্ঠ আসনে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আগ্রাসন ও পররাজ্য গ্রাসনীতি গ্রহণ করেছিলেন। এটিও বিশ্বকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মুখে ঠেলে দেয়।
6.ঔপনিবেশিক স্বার্থ সংঘাত : প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর অধিকাংশ উপনিবেশ ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের অধীনে চলে যায়। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত জার্মানি, ইটালি, জাপান প্রভৃতি দেশ ঔপনিবেশিক স্বার্থ সংঘাতে মেতে ওঠে।
7. হিটলারের পররাষ্ট্রনীতি : জার্মান একনায়ক শাসক হিটলারের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান কথা ছিল 'Pan-Germanism'। এই মতবাদ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে স্থিতাবস্থা নষ্ট হয়। তাই ঐতিহাসিক উডওয়ার্ডের মতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হিটলারের যুদ্ধ। তিনি এই যুদ্ধের পরিকল্পনা করেছিলেন, তিনি যুদ্ধ শুরু করেছিলেন এবং শেষপর্যন্ত তিনিই পরাজিত হয়েছিলেন।
8. তোষণ নীতি : হিটলারের উত্থান পর্বে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স তাঁর প্রতি যে তোষণ নীতি নিয়েছিল তা অন্যতম কারণ ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ।
জাতিসংঘের ব্যর্থতা : জাতিসংঘ বৃহৎ শক্তিবর্গের অন্যায় কাজের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে অপারগ থাকায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঘনীভূত হয়েছিল। ইটালির আবিসিনিয়া দখল কিংবা জাপানের মাঞ্চুরিয়া অধিকারের ঘটনায় লিগ দর্শকের ভূমিকা পালন করেছিল।
9.সমাজতন্ত্র ও ধনতন্ত্র সংঘাত : সমাজতান্ত্রিক দেশ রাশিয়ার উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে ধনতান্ত্রিক ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মধ্যে ভুল বোঝাপড়া, সন্দেহ প্রবণতা ও অস্তিত্বের সংকট বিশ্বযুদ্ধের পটভূমি গড়ে তুলেছিল।
10. অর্থনৈতিক মহামন্দা : ১৯৩০-এর দশকে বিশ্ব জুড়ে অর্থনৈতিক মহামন্দা বিশ্ব বাণিজ্য ও শিল্পায়ন প্রক্রিয়াকে প্রায় নষ্ট করে দেয়। ফলে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি চরম আকার ধারণ করায় সমস্যা আরও বৃদ্ধি পায়।
• প্রত্যক্ষ কারণ :
পোল্যান্ড আক্রমণ : রোম-বার্লিন-টোকিও অক্ষশক্তি গঠনের পর হিটলার পোলিশ করিডোর দখলে চেষ্টা করেন। এর ফলে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স তোষণ নীতির অসাড়তা বুঝতে পেরে হিটলারকে আটকানোর চেষ্টা করে । কিন্তু হিটলার এই বাধা নস্যাৎ করে ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের ১ সেপ্টেম্বর পোল্যান্ড আক্রমণ করেন। এই কারণে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স ৩ সেপ্টেম্বর পোল্যান্ডের পক্ষ অবলম্বন করলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ হয়।
উপসংহার : হিটলারের শ্বেত অভিযানের (পোল্যান্ড আক্রমণ) মধ্য দিয়ে এই যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটলেও বিশ্বের কমবেশি সমস্ত দেশকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য দায়ী করা যায়।বিশ্বের ইতিহাসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আজও একটি গুরুত্ত্বপূর্ণ ঘটনারূপেই বিবেচিত হয়।
আরো পড়তে পারেন:
1.প্রথম অধ্যায় ফরাসি বিপ্লবের কয়েকটি দিক অনুশীলনী
2. দ্বিতীয় অধ্যায় বিপ্লবী আদর্শ নেপোলিয়নীয় সাম্রাজ্য ও জাতীয়তাবাদ
3.তৃতীয় অধ্যায় উনবিংশ শতকের ইউরোপ রাজতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী ভাবধারার সংঘাত